জয়পুর, ২২ আগস্ট (হি.স.) : স্কুল পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে সিজেপি কর্মী ও গ্রামবাসীদের বিবাদের জেরে শনিবার রামপুরা-কাঁওরপুরা গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পুরনো জীর্ণ ভবন থেকে সরিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর করা হল। শুক্রবারের ঘটনার পর শনিবার সকালে পুরনো ভবন থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে গ্রামের একটি ভবনে স্কুলটি সরানো হয়। সেখানে ১৬ জনের বেশি পড়ুয়া ক্লাসে যোগ দেয়।
বাগরু বিধানসভা এলাকার ওই গ্রামে শুক্রবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে সিজেপি কর্মী ও গ্রামবাসীদের মধ্যে বচসা থেকে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনায় দুই পক্ষই শিবদাসপুরা থানায় পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছে। মারধর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।
এসিপি চাকসু ভবানী সিং জানান, শুক্রবার সিজেপির একটি দল সরকারি স্কুল পরিদর্শনে রামপুরা-কাঁওরপুরায় পৌঁছেছিল। পরিদর্শনের সময় দলটির সঙ্গে গ্রামবাসীদের বচসা ও পরে হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুই পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিজেপির সহ-সমন্বয়ক তথা মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কার অভিযোগ, তাঁদের দল স্কুল পরিদর্শনে গেলে গ্রামের ঢোকার মুখেই বাধা দেওয়া হয়। কর্মীদের মারধর, পাথর ছোড়া, গাড়ির কাচ ভাঙচুর এবং কয়েক জনের পোশাক ছিঁড়ে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করে রাঙ্কার অভিযোগ, বাইরে থেকে লোক ডেকে আনা হয়েছিল। ঘটনায় অভিযুক্ত কয়েক জনকে পরে স্থানীয় বিধায়ক কৈলাশ বর্মার সঙ্গে দেখা গিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সিজেপির তরফে ঘটনার কয়েকটি ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়েছে এবং অপর পক্ষের কাছেও থাকা ভিডিয়ো প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রামবাসীদের অভিযোগ, সিজেপির লোকজন দলবদ্ধভাবে গ্রামে এসে স্কুল পরিদর্শনের নামে তাঁদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান। তাঁদের দাবি, বাইরের লোকজনের আসায় গ্রামের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পড়ুয়াদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। কয়েক জন অস্ত্র নিয়ে এসে গ্রামবাসীদের ভয় দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। সিজেপির অভিযোগ অস্বীকার করে গ্রামবাসীরা জানান, স্কুলের জীর্ণ অবস্থার কথা বিবেচনা করেই প্রশাসন সেটি অন্যত্র সরিয়েছে।
ঘটনার পর গ্রামের বাসিন্দা রবিশঙ্কর শর্মার উদ্যোগে গ্রামের সম্মতিতে একটি ভবন স্কুল চালানোর জন্য দেওয়া হয়েছে। আগে সেখানে একটি মুদিখানা দোকান চলত। এখন সেখানেই ক্লাস হচ্ছে। শনিবার দুই শিক্ষকও পড়ুয়াদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তবে নতুন জায়গাতেও পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পড়ুয়াদের একটি অংশকে ঘরের বাইরে রোদে বসে পড়াশোনা করতে দেখা যায়। একটি ঘরের পাখাও খারাপ বলে পড়ুয়ারা জানিয়েছে। স্থায়ী স্কুল ভবন দ্রুত নির্মাণ অথবা পুরনো ভবন মেরামতের দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
শনিবার সন্ধ্যায় বাগরুর বিধায়ক কৈলাশ বর্মা রামপুরা গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে দেখা করেন। স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে সিজেপির প্রচারাভিযানকে নিশানা করে তিনি বলেন, গ্রামের স্কুলকে ‘ধ্বংসস্তূপ’ বা ‘গোয়ালঘর’ বলা ঠিক নয়। গ্রামে কৃষিকাজ ও পশুপালন দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মা সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছেন এবং বাগরু বিধানসভা এলাকায় ৬০টির বেশি স্কুলে কাজ হয়েছে। একসঙ্গে সমস্ত স্কুলের সমস্যা মেটানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সিজেপির আন্দোলনের হুঁশিয়ারি নিয়েও প্রশ্ন তুলে বর্মার অভিযোগ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেউ কেউ গ্রামগুলির পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
উপমুখ্যমন্ত্রী প্রেমচন্দ বৈরবা বলেন, শিক্ষার জায়গায় রাজনীতি করা উচিত নয়। সরকার হিংসারও বিরোধী। ঘটনায় কেউ ভুল করে থাকলে পুলিশ তদন্ত করছে এবং তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুদের সামনে রাজনীতি করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, পড়াশোনা, উদ্ভাবন ও সুষ্ঠু পরিবেশের মাধ্যমে পড়ুয়াদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এদিকে সিজেপি মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা জানান, স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও পড়ুয়াদের উন্নত শিক্ষার দাবিতে তাঁদের আন্দোলন চলবে। শিক্ষামন্ত্রী মদন দিলাওয়ারের পদত্যাগের দাবিকেও আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে সামনে আনার কথা জানান তিনি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবি পূরণ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
সিজেপির তিনটি প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে—স্কুল পরিদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নির্দেশ প্রত্যাহার, কর্মীদের উপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং যে স্কুলে পশুর গোয়ালঘরের মতো পরিস্থিতি থাকার অভিযোগ উঠেছে, সেখানে অবিলম্বে মেরামতির কাজ শুরু করা।
ঘটনার পর প্রতাপ নগর থানার পুলিশের বিরুদ্ধেও চাপ সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন রাঙ্কা। তাঁর দাবি, প্রায় ১৫ জন পুলিশকর্মী এক সিজেপি কর্মীর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। যদিও পুলিশ সেই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করছে।
ডিসিপি দক্ষিণ রাজর্ষি রাজ বর্মা জানান, দুই পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলের নকশা তৈরি করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে যার যে ভূমিকা সামনে আসবে, সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার জেরে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে কংগ্রেসও। টিকারাম জুলি-সহ কংগ্রেস নেতারা সিজেপির সুরে সুর মিলিয়ে রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামোর অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




