বিধানসভার সই জালিয়াতির মামলায় অবশেষে আজ, রবিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে কলকাতার ভবানীভবনে (সিআইডি সদর দফতরে) হাজিরা দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি নিজের বাসভবন থেকে বেরোন এবং ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় ভবানীভবনে এসে পৌঁছান। দুপুর ১২টায় হাজিরার নির্দেশ থাকলেও, নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই তিনি তদন্তকারীদের মুখোমুখি পৌঁছে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিআইডি-র শীর্ষ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে তাঁর জেরাপর্ব শুরু হতে চলেছে।
উল্লেখ্য, এর আগে আদালতের নির্দেশে তিন-তিনটি সমন এড়িয়ে গত
বৃহস্পতিবার সিআইডি সদর দফতরে হাজিরা দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন টানা
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের শীর্ষ গোয়েন্দারা তাঁকে ম্যারাথন
জেরা করেন। তবে সিআইডি সূত্রের দাবি, সেদিন বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে অভিষেক
কেবল "আমি জানি না" বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে
তিনি বেশ কয়েকবার মেজাজও হারান। রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ আধিকারিক সংবাদসংস্থা
পিটিআই (PTI)-কে জানিয়েছিলেন,
"বিধানসভার ওই বিতর্কিত
প্রস্তাব, তাতে থাকা বিধায়কদের স্বাক্ষর এবং সেই সংক্রান্ত নথিপত্রের
কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। এছাড়া তদন্তকারী দলের চাওয়া বেশ কিছু জরুরি রেকর্ডও
তিনি জমা দেননি।" ফলস্বরূপ, বৃহস্পতিবারের জবাবে সন্তুষ্ট না হয়েই আজ
প্রয়োজনীয় নথিপত্র সহ তাঁকে পুনরায় তলব করে সিআইডি।
আজকের এই হাজিরা ঘিরে ভবানীভবন চত্বরের রাজনৈতিক পারদ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুই-ই তুঙ্গে। সিআইডি সূত্রে খবর, আজ শুধু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, একই মামলায় তলব করা হয়েছে বেলেঘাটার বিধায়ক তথা উত্তর কলকাতা জেলা সভাপতি কুণাল ঘোষকেও। তদন্তকারীদের ধারণা, দুই নেতার বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। তাই তথ্যের অমিল দূর করতে এবং মূল সত্য উদ্ঘাটন করতে আজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কুণাল ঘোষকে সামনাসামনি বসিয়ে মুখোমুখি জেরা করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আজ রবিবাসরীয় দুপুরে ভবানীভবনের এই হাইভোল্টেজ জেরা থেকে কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই নজর রাখছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
তদন্তের মূল বিষয়বস্তু হলো গত মে মাসে তৃণমূল বিধায়কদের একটি দলীয় বৈঠকে যে সমস্ত বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁদের স্বাক্ষর কীভাবে ওই প্রস্তাবে স্থান পেল? প্রকৃতপক্ষে কারা ওই নথিতে সই করেছিলেন এবং আসল কপিটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে, তা খুঁজে বের করাই এখন সিআইডি-র প্রধান লক্ষ্য। ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ মে, যখন কালীঘাটে তৃণমূল বিধায়কদের এক বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিরোধী দলনেতা পদের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বিধানসভায় জমা দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ১৩ ও ১৪ মে তৃণমূল বিধায়কদের শপথ গ্রহণের পর, বিধানসভা সচিবালয় দলের কাছে বিরোধী দলনেতার মনোনয়নের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব চায়। এরপর ১৯ মে একটি নতুন বৈঠক ডেকে ৭০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। কিন্তু তৃণমূল বিধায়কদের জমা দেওয়া বিভিন্ন নথির স্বাক্ষরের মধ্যে ব্যাপক অমিল ও অসঙ্গতি ধরা পড়ায় বিধানসভা সচিবালয় থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। এর প্রেক্ষিতেই এফআইআর (FIR) দায়েরের পর মামলার তদন্তভার হাতে নেয় সিআইডি।
বৃহস্পতিবার রাতে ভবানীভবন থেকে বেরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সোজা কালীঘাটে
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিলেও, সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি
হয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ইতিমধ্যেই এই মামলায় একাধিক তৃণমূল বিধায়ককে জিজ্ঞাসাবাদ
করেছে রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা। আজকের এই জোড়া হাজিরা এবং কুণাল-অভিষেকের মুখোমুখি
জেরার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার ভবানীভবন চত্বরের নিরাপত্তা যেমন জোরদার করা
হয়েছে, তেমনই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও চড়ছে পারদ।



